এবার মেয়েদের সঙ্গে রাত কাটানো ও বেড়ানোর সুযোগ পেলেন জাপানি মা

দুই মেয়ের সঙ্গে চার রাত কাটানো ও তাদের নিয়ে বাসার বাইরে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ পেলেন জাপানি নারী নাকানো এরিকো। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ আজ বুধবার এ আদেশ দেন।
আদালত বলেছেন, ‘শিশুদের বাবা যদি মনে করেন, তিনিও কয়েক ঘণ্টার জন্য তাদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে পারবেন।’

আদালত বলেছেন, ৮ সেপ্টেম্বর (আজ) রাতে বাবা শিশুদের সঙ্গে থাকতে পারবেন। তবে ৯, ১১, ১৩ ও ১৫ সেপ্টেম্বর রাতে শিশুরা মায়ের সঙ্গে থাকবে। এক দিন পরপর দেওয়া হলো। এ সময় ওই বাসায় দিনে শিশুদের বাবা থাকবেন। মা যদি শিশুদের নিয়ে বেড়াতে যেতে চান, তা পারবেন। শিশুদের বাবা মনে করলে তিনিও দু–এক ঘণ্টার জন্য তাদের নিয়ে বাইরে বেড়াতে যেতে পারবেন।

গত ৩১ আগস্ট হাইকোর্টের দেওয়া আদেশের পরদিন ১ সেপ্টেম্বর থেকে গুলশানের একটি ফ্ল্যাটে রয়েছে জাপান থেকে আসা ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই শিশু। শিশুদের বাবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফ ওই বাসায় তাদের রাখার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। শুনানি নিয়ে ৩১ আগস্ট হাইকোর্টের একই বেঞ্চ আদেশে দেন।

আদেশে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, শিশুদের বাবা ও মা যৌথভাবে আপাতত তাদের দেখাশোনা করতে পারবেন। ওই ফ্ল্যাটের ব্যয় মা-বাবা সমান হারে বহন করবেন। শিশুদের বাবা ও মায়ের ওই বাসায় অবস্থান করার স্বাধীনতা থাকবে। শিশুদের সঙ্গে তাদের বাবা ও মা একান্তে সময় কাটাবেন। সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিষয়টি সার্বক্ষণিক তদারক করবেন।

শিশুদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবেন। শিশু ও তাদের মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনারকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাইকোর্টের ওই আদেশ সংশোধন চেয়ে শিশুদের মা এরিকো ৬ সেপ্টেম্বর আবেদন দাখিল করেন। এতে শিশুদের সঙ্গে তাদের বাবা ইমরান শরীফের সময় কাটানোর তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া,

ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সংরক্ষণের জন্য ইমরান শরীফ কর্তৃক বাসায় বসানো সিসিটিভি ক্যামেরা অপসারণ, বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যম থেকে তাঁর (এরিকো) বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভিডিও অপসারণে বিটিআরসির চেয়ারম্যানের প্রতি নির্দেশনা, ভিডিও তৈরি ও আপলোডে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের প্রতি নির্দেশনা চাওয়া হয়।

আবেদনের শুনানি নিয়ে আজ আদেশ দেওয়া হয়। আদালতে শিশুদের মায়ের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। শিশুদের বাবার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ফাওজিয়া করিম ফিরাজ। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার।

শুনানি নিয়ে আদালত বলেন, বিভিন্ন অনলাইন ও প্ল্যাটফর্মে এরিকোর বিরুদ্ধে অবমাননাকর ভিডিও অপসারণে পদক্ষেপ নিতে বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে বলা হলো। ইমরান শরীফের ক্ষেত্রে অবমাননাকর ভিডিও থাকলে তাও সরাতে পদক্ষেপ নিতে বলা হলো। এসব ভিডিও তৈরি ও আপলোডে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলা হলো। সিসিটিভি ক্যামেরা ঘরের বাইরে দিকে থাকবে।

ঘটনার পূর্বাপর

২০০৮ সালের ১১ জুলাই জাপানি নাগরিক নাকানো এরিকো ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ইমরান শরীফের বিয়ে হয়। তাঁদের তিন মেয়েসন্তান আছে। শিশুদের বয়স যথাক্রমে ১১, ১০ ও ৭ বছর। গত ১৮ জানুয়ারি এরিকোর সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের আবেদন করেন ইমরান। পরবর্তী সময়ে গত ২১ ফেব্রুয়ারি দুই মেয়েকে নিয়ে দুবাই হয়ে বাংলাদেশে চলে আসেন তিনি। আর ছোট মেয়েকে তার নানির কাছে রেখে গত ১৮ জুলাই শ্রীলঙ্কা হয়ে বাংলাদেশে আসেন এরিকো।

ইমরানের কাছ থেকে ১০ ও ১১ বছর বয়সী দুই মেয়েশিশুকে ফিরে পেতে বাংলাদেশে এসে গত ১৯ আগস্ট রিট করেন এরিকো। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট দুই শিশুকে ৩১ আগস্ট আদালতে হাজির করতে তাদের বাবা ও ফুফুকে নির্দেশ দেন। শিশুদের আদালতে উপস্থিতি নিশ্চিত করতে গুলশান ও আদাবর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বলা হয়।

তবে এর আগে ২২ আগস্ট রাতে বাবার কাছ থেকে ওই দুই শিশুকে নিয়ে আসে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এ অবস্থায় ২৩ আগস্ট শিশুদের ফিরে পেতে আদালতে আবেদন করেন শিশুদের বাবা। সেদিন হাইকোর্ট দুই শিশুসন্তানকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ঢাকা মহানগর পুলিশের ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টারে (উইমেন সাপোর্ট সেন্টার) রাখতে আদেশ দেন। তখন আদালত বলেন, এ সময়ে সকালে মা ও বিকেলে বাবা তাঁদের মেয়েদের সঙ্গে দেখা করা ও সময় কাটাতে পারবেন।

আদেশ অনুসারে ধার্য তারিখ ৩১ আগস্ট উইমেন সাপোর্ট সেন্টার থেকে সিআইডির তত্ত্বাবধানে দুই শিশু আদালতে উপস্থিত হয়। আদালতে উপস্থিত হন তাদের বাবা ইমরান ও মা এরিকো। খাসকামরায় দুই শিশুর বক্তব্য শোনেন আদালত। শিশুদের মা-বাবার বক্তব্যও শোনেন। সব পক্ষের শুনানি নিয়ে ৩১ আগস্ট হাইকোর্ট গুলশানের ফ্ল্যাটে শিশুদের রাখার আদেশ দেন।

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *