Categories
Uncategorized

সরকারি চাকুরেরা কি আইনের উর্ধ্বে?

সাম্প্রতিক সময়ে প্রতারণা, জালিয়াতি এবং দুর্নী’তির অভিযোগে অত্যন্ত সোচ্চার হয়েছে সরকার। রিজেন্ট হাসপাতালের অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রতারক সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, জেকেজি কেলেঙ্কারিতে আরিফুল হক চৌধুরী -ডা. সাবরিনাকে ধরা হয়েছে। দুর্নী’তি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্যখাতে দুর্নী’তির শিরোমনি মিঠুকে তলব করেছে।

এরকম দৃশ্যমান কিছু দুর্নী’তি এবং প্রতারণা বিরোধী অভিযান জনমনে আশার সঞ্চার করেছে। বিশেষ করে র‍্যাব অভিযান চালিয়ে প্রতারণার যে লোমহর্ষক তথ্য প্রকাশ করছে তাতে জনগণ কিছুটা হলেও আশান্বিত হচ্ছে। আস্থার জায়গা ফিরে পাচ্ছে। কিন্তু এই সমস্ত দুর্নী’তি-প্রতারণা বিরোধী অভিযানে একটি অংশ ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে। তাঁরা হলো সরকারি চাকুরেরা।

এটা শুধু এখন নয়, বিভিন্ন সময়ে আমরা দেখেছি যে, একদম নিম্ন স্তরের চাকুরে থেকে শুরু করে উচ্চ পর্যায়ের চাকুরেরা কখনোই দুর্নী’তি, প্রতারণা বা অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত হন না। তাঁরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে পার পেয়ে যান। অথচ সরকারি খাতে যেকোন অনিয়ম, প্রতারণা, দুর্নী’তি সরকারের বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রত্যেক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া অসম্ভব ব্যাপার। স্বাস্থ্যখাতের দুর্নী’তির অন্যতম গডফাদার আফজাল, তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিম্নশ্রেনীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন।

অথচ তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গেছেন। এখন তিনি বিচারের আওতা বহির্ভূত। সদ্য বিদায়ী স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ সবগুলো অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন এবং সবগুলো অনিয়মের কোন দায়দায়িত্ব তিনি কোনভাবেই এড়াতে পারবেন না। কিন্তু এখন পর্যন্ত সাবেক এই মহাপরিচালকের বিরুদ্ধে কোন আইনত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।

অথচ রিজেন্ট হাসপাতালের সঙ্গে তিনি কেবল চুক্তিই করেননি, তিনি ঐ হাসপাতালকে সরকারি জিনিসপত্র নিয়ম ভঙ্গ করে দিয়েছেন, জেকেজি’কে নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দিয়েছেন। মিঠু সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে সাবেক এই মহাপরিচালকের ভূমিকা নিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরেই মুখরোচক আলোচনা হতো সবসময়। অথচ এই ঘটনায় তিনি ধরাছোঁয়ার বাইরে।

রিজেন্ট কেলেঙ্কারিতে প্রতারক সাহেদকে গ্রেপ্তারের পর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয় যে, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে এবং পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎকালীন মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হলে তাঁর উত্তরে তিনি বলেন যে, সাবেক সচিব আসাদুল ইসলামের মৌখিক নির্দেশেই তিনি রিজেন্টের সঙ্গে চুক্তি করেন। রিজেন্টের মালিক প্রতারক সাহেদকে গ্রেপ্তার করা হলেও এখন পর্যন্ত এই আসাদুল ইসলাম কেন মৌখিক নির্দেশ দিয়েছিলেন, কার দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নির্দেশ দিয়েছিলেন সে ব্যাপারে কোন তথ্য জনগণের কাছে আসেনি।

কিন্তু স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সাবেক এই সচিব পদোন্নতি পেয়ে এখন পরিকল্পনা কমিশনে আছেন। অথচ করোনায় যে ব্যর্থতা সেই ব্যর্থতার দায় তিনি কোনভাবেই এড়াতে পারেন না। একইভাবে সাহেদ কেলে’ঙ্কারিতে প্রশাসনের কিছু সাবেক কর্মকর্তার নাম গণমাধ্যমে চাউর হয়েছে। অথচ তাঁদেরকেও এখন পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনা বা তাঁরা কিভাবে সাহেদকে পৃষ্ঠপোষকতা দিলেন, সাহেদ কিভাবে নিয়মিত প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেত এই সমস্ত বিষয় নিয়ে মোটেও কথাবার্তা হচ্ছে না।

আমরা দেখি যে, দুর্নী’তি বিরো’ধী অভিযান যখন হয়, তখন কিছু সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিকে ধরা হয়। এর আগে আমরা দেখেছি যে, জিকে শামীমকে যখন গ্রেপ্তার করা হলো তখন তাকে যারা পৃষ্ঠপোষকতা দিতো, যাদের মাধ্যমে জিকে শামীম টেন্ডার মাফিয়া হয়ে উঠেছিল তাঁদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বিশ্লেষকরা মনে করেন যে, দুর্নী’তি, জালিয়াতি, প্রতারণা বন্ধ করতে গেলে এর উৎসে যেতে হবে এবং এই ধরণের ঘটনা সরকারের কিছু দুর্নী’তিবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মদদ এবং পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া অসম্ভব। তাই যারা এই ধরণের ঘটনাগুলো আশ্রয় প্রশ্রয় দিচ্ছেন, যারা লাভবান হচ্ছেন তাঁরা কেন আইনের উর্ধ্বে থাকবেন সেই প্রশ্ন জনগণের মধ্যে উঠছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *