Categories
Uncategorized

সেদিন তিনি বলে-কয়ে ‘এভারেস্ট’ গড়েছিলেন

টিভিতে ওরকম শরীর ও কবজি মোচড়ানো অ্যাকশন দেখে অনেকেরই বিস্ময় জেগেছে। কবজিতে বিয়ারিং-টিয়ারিং কিছু আছে নাকি! হাতটা নিয়ে পরখ করে তো আর দেখা সম্ভব না। চেষ্টাটা তাই চলেছে নিজের শরীরের ওপর। স্কুলজীবনে তাই অনেকেই অ্যাকশনটা নকল করেছেন। হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছেন, সত্যি বলকে অতটা বাঁক খাওয়ানো সম্ভব!

মুত্তিয়া মুরালিধরনের শরীরে প্রতিবন্ধকতা ছিল। প্রতিভা ও চেষ্টার মিশ্রণে সেটুকু রূপান্তরিত করেছিলেন নির্ভেজাল সুবিধায়। ওয়াইডের দাগ বরাবর জায়গা থেকে থেকে বল বাঁক নিয়ে ঢুকেছে স্টাম্পে। ‘দুসরা’র বাঁকও ছিল চোখ রগড়ে দেওয়ার মতো। সাকলায়েন মুশতাকের দুসরাও অত বাঁক পেত না। এই বাঁক ক্রিকেট পরিসংখ্যানের কতটা গভীরে ঢুকেছে তা নিশ্চয়ই মনে আছে!

কিংবা কতটা উঁচুতে? কিংবদন্তি পর্বতারোহী জর্জ ম্যালরিকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, এভারেস্টে উঠতে চান কেন? ম্যালরি নির্মোহ কণ্ঠে জবাব দেন, ‘কারণ ওটা ওখানে।’ কী স্বাভাবিক অথচ গভীর জবাব। আসলে জয়ের তাড়না মানুষের রক্তে।

মানুষ এই মাটির পৃথিবীতে কিছু-সে হোক পর্বত কিংবা নতুন কোনো মাইলফলক-অজেয় বা গড়া বাকি রেখে যাবে সে ভাবনা অপ্রত্যাশিত। জয় কিংবা গড়ার দুর্দমনীয় ইচ্ছা থেকেই হয়তো ম্যালরি ওই কথা বলেছিলেন। তেমনি মুরালিও ভীষণ কঠিন এক চ্যালেঞ্জ নিজের ইচ্ছাতেই কাঁধে তুলে নিয়ে বলেছিলেন, এটাই শেষ।

হ্যাঁ, এক দশক আগের সেই গল টেস্টের কথা বলা হচ্ছে। ভারতের বিপক্ষে সেই টেস্টে মাঠে নামার আগে ৩৮ বছর বয়সী মুরালিধরন জানিয়ে দিয়েছিলেন এটা তাঁর শেষ টেস্ট। বয়স মুরালির জন্য তখনো কোনো মাথাব্যথা ছিল না। শ্রীলঙ্কা দলের জন্য তো নয়-ই। স্পিন জাদুকর তখনো লঙ্কান বোলিংয়ের ফলা। কুমার সাঙ্গাকারা ও মাহেলা জয়াবর্ধনে তো অবাক। আরও কিছুদিন সেবা পাওয়ার মিনতি ছিল তাঁদের। শুধু দলের নয়, তাঁরা ভেবেছিলেন মুরালির কথাও।

মুরালি তখন টেস্টে সর্বোচ্চ উইকেটশিকারি। বাকিরা প্রমাণ দূরত্বে পিছিয়ে। কিন্তু ওই যে মানুষের চ্যালেঞ্জ নিয়ে জয়ের তাড়না, জর্জ ম্যালরির ভাষায় ‘বিকজ ইটস দেয়ার’-মুরালিও চোখ রেখেছিলেন এক ‘এভারেস্ট’-এ। ৮০০ উইকেটের অদৃশ্য এক চূড়া। টেস্টে মর্ত্যের কোনো মানুষ যা ছুঁয়ে দৃশ্যমান করতে পারেনি। ৭৯২ উইকেট নেওয়া মুরালি তাই লক্ষ্যস্থির করেন এভাবে, ক্যারিয়ারের শেষে টেস্টে ৮ উইকেট নিয়ে ছোঁবেন ৮০০। সেটিও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্পিন খেলতে সিদ্ধহস্ত শচীন, দ্রাবিড়, লক্ষ্মণদের ভারতের বিপক্ষে। ভাবা যায়!

শেন ওয়ার্নকে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার ক্যারিয়ারের চিত্রনাট্য কার লেখা? একই কথা খাটে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর ক্ষেত্রেও। সম্ভবত শেষটায় একটু বেশিই খাটে।

মুরালি কতটা স্থির সংকল্প ছিলেন শুনুন সাঙ্গাকারার মুখে। সে সিরিজে অধিনায়ক ছিলেন তিনি। ভারতের স্পিনার রবিচন্দ্রন অশ্বিনের সঙ্গে অনলাইন আলাপচারিতায় কথাগুলো বলেন সাঙ্গা, ‘মুরালি বলেছিল ভারত সিরিজেই অবসর নেবে। তখন আমি অধিনায়ক। নির্বাচকদের কথা ছিল, সে প্রথম টেস্ট খেলেই অবসর নিতে চায়। এটা হবে না। ওই ৮টা উইকেট নেবে, তারপর।’

লঙ্কান কিংবদন্তি ১০ বছর আগের সেই ম্যাচের স্মৃতিচারণের এ অংশ পর্যন্ত এসে এটুক ঢোক গিললেন। যেন বোঝাতে চাইলেন, মুরালি যে বলে কয়ে শেষ টেস্টে ৮ উইকেট নিতে পারবেন সে আস্থা ছিল না নির্বাচকদের। সত্যি বলতে অনেকেরই ছিল না। আর এটাই স্বাভাবিক। টেস্টে ভারতের বিপক্ষে স্পিনে এক ম্যাচে ৮ উইকেট নেওয়া অনেকটা এভারেস্টে ওঠার মতোই কঠিন। প্রতিদিন দেখা যায় না। বলে কয়ে করা তো বহু দূরের বিষয়।

সাঙ্গাকারা বলে যান, ‘আমরা এপর মুরালিকে মিটিংয়ে ডাকি। তাকে বলি, আমরা জানি তুমি চ্যালেঞ্জ নিতে ভালোবাসো।কিন্তু বিষয়টি এভাবে দেখ, ৮০০ উইকেট নেওয়ার খুব কাছে গিয়ে যদি তা ছুঁতে না পারো এবং অবসর নাও সেটা মর্মান্তিক। আমরা বলি কি, শরীর সায় না দিলে দ্বিতীয় টেস্টে খেলার দরকার নেই। পরের টেস্টে খেল। কিংবা দুই টেস্টেই বিশ্রাম নাও। পরের সিরিজে এসে ৮০০ উইকেট নিয়ে শেষ করো।’

মুরালির জবাব ছিল, ‘না। এটা হবে না। আমি চ্যালেঞ্জ ভালোবাসি। যদি আমি সত্যি সত্যি সেরা স্পিনারই হয়ে থাকি তাহলে গলে (স্পিনবান্ধব বাইশ গজ) যে কোনো দলের বিপক্ষে ৮ উইকেট নেওয়া উচিত। আর আমি ৮ উইকেট পেলে শুধু ৮০০ উইকেট নেওয়াই নয়, আমরা ম্যাচটাও জিতে নেব। আর না পেলে নেই। ধন্যবাদ। আমি ৮ উইকেট নেব।’ সাঙ্গা বলে যান, ‘তার পাশেই বসে ছিলাম। ভাবছিলাম, চ্যাম্পিয়নরা এমনই হয়।’

গল টেস্টের তৃতীয় দিন পর্যন্ত ১টি উইকেট নিতে পেরেছিলেন মুরালি। দ্বিতীয় দিন পুরো ধুয়ে যায় বৃষ্টিতে। তখন পর্যন্ত তাঁর ঝুলিতে ছিলেন শুধু শচীন টেন্ডুলকার। কিন্তু চতুর্থ দিনে এসে দুই ইনিংস মিলিয়ে মোট ১২ উইকেট হারায় ভারত। এর মধ্যে ৫টি মুরালির। শেষ দিনে ফলো অন করছিল ভারত। মুরালির দরকার ছিল ২ উইকেট।

বলে রাখা ভালো গল টেস্টে ভারত দুই ইনিংস মিলিয়ে খেলেছিল মোট ১৮০.৪ ওভার। মুরালি একাই করেছিলেন ৬১.৪ ওভার। এর মধ্যে ভারতের প্রথম ইনিংসে ১৭ ওভারে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৪.৪ ওভারে ৩ উইকেট। হ্যাঁ, মুরালির অনমনীয় মানসিকতার কাছে হার মেনেছিলেন সতীর্থরা। সাঙ্গা তাই চেষ্টা করেছিলেন তাঁকে দিয়ে যতটা সম্ভব বল করাতে। যেন কাজটা করতে মুরালি পর্যাপ্ত সুযোগ পান। ১৭ ওভারে ৫ উইকেট এই সুযোগ করে দেওয়ার পক্ষে কতটা কথা বলে? বরং তা মুরালির সামর্থ্যের উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

শেষ দিনে লেজের ব্যাটসম্যানদের নিয়ে ব্যাট করছিলেন ভিভিএস লক্ষ্মণ। দিনটা কোনোভাবে কাটিয়ে দেওয়াই উদ্দেশ্য। তার আগেই হরভজন সিংকে তুলে নিয়ে ৭৯৯-এ চলে এসেছিলেন মুরালি। লক্ষ্মণ রান আউট হওয়ার পর ভর করল শঙ্কা। হ্যাঁ, মুরালিকে ৮০০ উইকেট নিতে দেখার প্রত্যাশাটা তখন ছাপিয়ে গেছে লঙ্কান মানচিত্র। ধারাভাষ্যকারদের কণ্ঠে উত্তেজনা। গ্যালারি থেকে টিভির সামনেও ঠিক এক দশা। হবে তো! এক একটা অফ স্পিন, এক একটা দুসরায় চোখের কাঁপুনি। এই বুঝি হয়ে গেল!

শেষ পর্যন্ত হলো। প্রজ্ঞান ওঝা ক জয়াবর্ধনে ব মুরালিধরন। টেস্ট ক্রিকেটে এই বোলিং-স্লিপ ফিল্ডিং জুটির রেকর্ড ৭৭তম শিকার। মুরালির রেকর্ড ৮০০ উইকেট। আর রিচার্ড হ্যাডলির মতো টেস্ট ক্রিকেটে নিজের শেষ বলে উইকেট। শেষ দানে বাজিমাতের এমন চিত্রনাট্যই জমা রেখেছিল গৌরবময় অনিশ্চয়তার খেলা।

শ্রীলঙ্কা সেই টেস্ট ১০ উইকেটে জিতেছিল। মুরালি চড়েছিলেন সতীর্থদের কাঁধে। সাঙ্গাকারা-ম্যাথুসদের চোখেমুখে তৃপ্তির ঝিলিক। তাঁদের চোখের ভাষায় কি নিচের অব্যক্ত কথাগুলো ছিল?

এই লোকটা ক্যারিয়ারের শুরু থেকে উইকেটের একপ্রান্ত দিয়ে ক্লান্তিহীন বল করে বলতে গেলে একাই টেনেছে দেশকে। সিড লো-র ভাষায়, ‘ক্রিকেট বিশ্বে শ্রীলঙ্কার মানচিত্র স্থাপন করেছে মুরালি।’ আবার এই লোকটারই অ্যাকশনের বৈধতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। একাধিকবার দিতে হয়েছে পরীক্ষা, কখনো নিজের খরচে। অ্যাকশন নিয়ে প্রশ্ন থাকায় শতাব্দীর সেরা ক্রিকেটারদের তালিকায় তাঁকে হয়তো অনেকেই রাখবেন না। টেস্টে সর্বকালের সেরা একাদশেও উপেক্ষা করতে পারেন অনেকে। কিন্তু ডন ব্র্যাডম্যানের ব্যাটিং গড়ের মতোই মহিমা ধারণ মুত্তিয়া মুরালিধরনের ৮০০ উইকেট। এই চূড়া এড়িয়ে টেস্ট ক্রিকেটের মানচিত্র হয় না। তা শুধু জয়ের চেষ্টাই করা যায়, কিন্তু কেউ কখনো জয় করতে পারবে কি না, মুরালিকে সে প্রশ্ন রেখে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন তাঁর-ই সতীর্থরা।

আজ নিশ্চয়ই প্রশ্নটা আবার উঠেছে। ১০ বছর আগে মুরালি ৮০০-র চূড়াটা যে গড়ে দেখিয়েছিলেন এই দিনে!

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *